উত্তরায় ‘মামলার টার্গেট’ ঘিরে বিতর্ক, আতঙ্কে চালকরা

উত্তরায় ‘মামলার টার্গেট’ ঘিরে বিতর্ক, আতঙ্কে চালকরা

উত্তরায় ‘মামলার টার্গেট’ ঘিরে বিতর্ক, আতঙ্কে চালকরা

 নিজস্ব প্রতিবেদক:

রাজধানীর উত্তরা এলাকায় ট্রাফিক আইন লঙ্ঘনের ঘটনায় ব্যবস্থা নেওয়ার পাশাপাশি প্রতিদিন নির্দিষ্টসংখ্যক মামলা করার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে—এমন অভিযোগ উঠেছে ট্রাফিক বিভাগের বিরুদ্ধে।

সংশ্লিষ্টদের অভিযোগ, উত্তরা ট্রাফিক বিভাগের প্রতিটি সার্জেন্টকে আট ঘণ্টার ডিউটিতে ন্যূনতম পাঁচটি মামলা করার লক্ষ্য দেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি বিশেষ ‘ট্যাংগো’ কলসাইনের মাধ্যমে ন্যূনতম ২০টি মামলা করার টার্গেট দেওয়া হচ্ছে বলেও অভিযোগ রয়েছে।

এ ছাড়া ‘কুইক রেসপন্স টিম’ (কিউআরটি) গঠন করে দিনভর মামলা দেওয়ার কার্যক্রম পরিচালনা করা হচ্ছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি। এসব নির্দেশনার পর থেকে উত্তরা এলাকায় গাড়ি ও মোটরসাইকেল চালকদের মধ্যে আতঙ্ক ও ক্ষোভ তৈরি হয়েছে বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে। সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, সম্প্রতি উত্তরা ট্রাফিক বিভাগের এক ব্রিফিংয়ে সার্জেন্টদের প্রতিদিন ন্যূনতম পাঁচটি মামলা করার নির্দেশ দেওয়া হয়।

এরপর থেকেই বিভিন্ন সড়ক ও গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্টে মামলা দেওয়ার কার্যক্রম বেড়েছে বলে অভিযোগ করছেন চালকরা। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক উত্তরা ট্রাফিক বিভাগের একাধিক সার্জেন্টের দাবি, আইন ভঙ্গের ঘটনা না থাকলেও নির্ধারিত লক্ষ্য পূরণের জন্য মামলা করার চাপ রয়েছে। একজন সার্জেন্ট বলেন, “আইন ভঙ্গ না করলেও টার্গেট পূরণ করতে হয়। ডিউটি শেষে ন্যূনতম পাঁচটি মামলার হিসাব দিতে না পারলে জবাবদিহি করতে হয়।

 তাই বাধ্য হয়েই ছোটখাটো বিষয়ে মামলা দিতে হয়। এর ফলে সাধারণ মানুষের গালমন্দও শুনতে হয়।” তবে ট্রাফিক পুলিশের পক্ষ থেকে নির্দিষ্টসংখ্যক মামলা করাকে বাধ্যতামূলক করার বিষয়টি অস্বীকার করা হয়েছে।

 ‘আইনে মামলা করার কোটা নেই’ এ বিষয়ে সুপ্রিম কোর্টের একজন আইনজীবী বলেন, “সড়ক পরিবহন আইন, ২০১৮-এর কোথাও বলা নেই যে পুলিশকে দিনে নির্দিষ্টসংখ্যক মামলা করতে হবে। আইন অনুযায়ী, অপরাধ সংঘটিত হলে ব্যবস্থা নেওয়ার কথা। কোটা সিস্টেম থাকলে তা আইন প্রয়োগের উদ্দেশ্যের সঙ্গে সাংঘর্ষিক হতে পারে এবং ক্ষমতার অপব্যবহারের প্রশ্নও উঠতে পারে।”

চালকদের অভিযোগ, ‘টার্গেট আছে’ বলে মামলা উত্তরার মেট্রোরেল সেন্টার স্টেশনের কাছে এক প্রাইভেট কার চালক অভিযোগ করেন, তার গাড়ির কাগজপত্র ঠিক থাকা সত্ত্বেও অটোরিকশার ধাক্কায় সামান্য লুকিং গ্লাস ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার ঘটনায় তাকে মামলা দেওয়া হয়। তার অভিযোগ, “গাড়ির কাগজপত্র সব ঠিক ছিল। কিন্তু অনুমোদনহীন একটি অটোর ধাক্কায় সামান্য লুকিং গ্লাস ভাঙার বিষয়কে কেন্দ্র করে মামলা দেওয়া হয়েছে।

 বিষয়টি পরিবর্তনের জন্য কোনো সময়ও দেওয়া হয়নি। প্রতিবাদ করতে গেলে গাড়ি ডাম্পিংয়ের হুমকি দেওয়া হয়। সার্জেন্ট বলেন, ‘স্যারের টার্গেট আছে।’” ওই চালকের ভাষ্য, “এটা সাধারণ মানুষের সঙ্গে ডাকাতির শামিল।” অন্যদিকে মোটরসাইকেল চালক মুশফিক অভিযোগ করেন, সিগন্যালে দাঁড়িয়ে প্রচণ্ড গরমের মধ্যে হেলমেট খুলে রাখার কারণে তাকে মামলার মুখোমুখি হতে হয়েছে। তিনি বলেন, “সিগন্যালে দাঁড়িয়ে প্রচণ্ড গরমে হেলমেট খুলেছিলাম। এ কারণে মামলার শিকার হতে হয়েছে।

 এদের কার্যক্রমে আমরা অতিষ্ঠ।” উত্তরার বিভিন্ন সড়ক ও গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্টেও ট্রাফিক সদস্যদের মামলা দেওয়ার বিষয়ে চালকদের সঙ্গে তর্ক-বিতর্কে জড়ানোর অভিযোগ পাওয়া গেছে। কোথাও কোথাও ট্রাফিক সদস্যদের বলতে শোনা গেছে—“কোন কারণে মামলা দিচ্ছেন, জবাব আছে আপনার কাছে?” বিশেষজ্ঞদের উদ্বেগ ট্রাফিক বিশেষজ্ঞদের মতে, মামলা দেওয়ার ক্ষেত্রে যদি নির্দিষ্ট টার্গেট নির্ধারণ করা হয়, তাহলে তা দীর্ঘমেয়াদে ট্রাফিক ব্যবস্থাপনার ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।

 তাদের মতে, আইন প্রয়োগের মূল লক্ষ্য হওয়া উচিত সড়কে শৃঙ্খলা নিশ্চিত করা, দুর্ঘটনা কমানো এবং যান চলাচল স্বাভাবিক রাখা। নির্দিষ্টসংখ্যক মামলা করার চাপ থাকলে ট্রাফিক সদস্যদের একটি অংশ অপরাধ প্রতিরোধ ও যানজট নিয়ন্ত্রণের পরিবর্তে মামলা পূরণের দিকে বেশি মনোযোগী হয়ে পড়তে পারেন। এতে পুলিশের প্রতি সাধারণ মানুষের আস্থা কমার পাশাপাশি অনিয়ম ও ঘুষ লেনদেনের সুযোগ তৈরি হওয়ার আশঙ্কাও রয়েছে।

তাদের আরও দাবি, উত্তরার গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্টগুলোতে যানজট থাকলেও যদি ট্রাফিক সদস্যরা মামলা দেওয়ার কাজে বেশি ব্যস্ত থাকেন, তাহলে সামগ্রিক ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা বাধাগ্রস্ত হতে পারে। পুলিশের বক্তব্য তবে নির্দিষ্টসংখ্যক মামলা করা বাধ্যতামূলক—এমন অভিযোগের সঙ্গে একমত নন উত্তরা ট্রাফিক পুলিশের উপ-পুলিশ কমিশনার (ডিসি) মো. শাহজাহান হোসেন। তিনি বলেন, “সারাদিনে একটি মামলা না করলেও বাধা নেই। তবে সড়কে লক্কড়-ঝক্কড় গাড়ি দৃশ্যমান এবং সাধারণ মানুষের মাঝে আইন না মানার প্রবণতা অনেক বেশি।

ট্রাফিক সদস্যরা যেন বসে না থাকে এবং ট্রাফিক ব্যবস্থায় যেন প্রতিবন্ধকতা না হয়, সেজন্যই এ নির্দেশনা।” তিনি আরও বলেন, “লক্কড়-ঝক্কড় ও ফিটনেসবিহীন গাড়ি মামলার আতঙ্কে মূল সড়ক এড়িয়ে চলে। এতে সড়কে গাড়ির সংখ্যা যেমন কমে, তেমনি বৈধ কাগজপত্র নিয়ে চলাচল করা সাধারণ যানবাহনও নির্দ্বিধায় চলাচল করতে সক্ষম হয়।”

উত্তরা এলাকায় ট্রাফিক আইন প্রয়োগের নামে নির্দিষ্টসংখ্যক মামলা করার অভিযোগ এবং পুলিশের পক্ষ থেকে তা অস্বীকার—দুই ধরনের বক্তব্যই সামনে আসায় বিষয়টি নিয়ে চালক ও সাধারণ মানুষের মধ্যে আলোচনা অব্যাহত রয়েছে। আইন প্রয়োগের ক্ষেত্রে নির্ধারিত টার্গেট আদৌ রয়েছে কি না এবং থাকলে তার উদ্দেশ্য ও কার্যকারিতা কী—তা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে।